প্রধান সম্পাদকের কথা ও এই সংখ্যার বিষয়বস্তু
শ্বেত কাশের দোলা, নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ, শিউলির গন্ধ আর ভোরের হালকা শিশির—শরৎ এলেই বাঙালির মন যেন আপনিই পথের দিকে তাকায়। সারা বছরের ব্যস্ততা, ক্লান্তি, দুঃখ-দুর্দশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে রেখে আমরা খুঁজতে বেরিয়ে পড়ি অন্য এক পৃথিবীকে।
সে পৃথিবী আমাদের খুব চেনা, অথচ প্রতিবারই নতুন।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়—এ এক বৃহৎ সামাজিক উৎসব, এক সাংস্কৃতিক মহোৎসব। শহরের গলি থেকে গ্রামের মেঠোপথ, বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে বারোয়ারি মণ্ডপ, নদীর ঘাট থেকে পাহাড়ের কোলে—সর্বত্র শরৎ তার নিজস্ব রঙে, নিজস্ব ছন্দে নিজেকে প্রকাশ করে।
আর সেই কারণেই দুর্গাপুজোর সঙ্গে ভ্রমণের সম্পর্ক এত গভীর।
কলকাতার পুজো দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কলকাতার বাইরে যে আরও এক বিশাল পুজোর পৃথিবী রয়েছে, তার খবর আমরা কতটুকুই বা রাখি? কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের কয়েকশো বছরের পুরনো পুজো, কোনও বনেদি পরিবারের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, কোনও ছোট শহরের নিজস্ব শিল্পরীতি, কিংবা কোনও পাহাড়ি জনপদের শরৎ—সবই তো আমাদের ভ্রমণের অংশ হতে পারে।
এই সংখ্যায় তাই আমরা শুধু পুজো দেখার পথ দেখাতে চাইনি; পুজোর ভিতর দিয়ে বাংলাকে এবং ভারতকে দেখার চেষ্টা করেছি।
কলকাতার থিমপুজো থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের প্রাচীন পুজো, বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে গ্রামবাংলার পারিবারিক দুর্গোৎসব—এই সংখ্যার পাতায় রয়েছে পুজোর নানা রূপ। বাংলার সীমানা পেরিয়ে আমাদের যাত্রা পৌঁছেছে ছত্তিসগড়ের বাস্তারে, হরিদ্বার-ঋষিকেশে, বারাণসীর ঘাটে এবং আরও নানা অচেনা পথে।
কারণ ভ্রমণ মানেই শুধু দূরে যাওয়া নয়। চেনা পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখাও ভ্রমণ।
একটি পুরনো ঠাকুরদালানে দাঁড়িয়ে আমরা বুঝতে পারি, কত ইতিহাস নিঃশব্দে আমাদের চারপাশে বেঁচে আছে। কোনও গ্রামের পুজোমণ্ডপে বসে আবিষ্কার করি মানুষের মিলনের অন্য এক ভাষা। কোনও পাহাড়ি ভোরে বুঝতে পারি, শরতের আকাশ কতটা গভীর হতে পারে। আবার কোনও নদীর ঘাটে হাজার প্রদীপের আলোয় মনে হয়—মানুষের উৎসব আসলে পৃথিবীরই এক প্রাচীন ভাষা।
প্রতিমার চোখে একটি বাংলাকে দেখা
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ প্রতিমা। কিন্তু প্রতিমা কি সর্বত্র একই?
একেবারেই নয়।
কোথাও সাবেকি একচালা প্রতিমা, কোথাও ডাকের সাজ, কোথাও মাটির কাজ, কোথাও বাঁশ, কাপড়, কাঠ কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনও উপকরণে নির্মিত শিল্পকর্ম। কলকাতার থিমপুজো এই বৈচিত্র্যকে আরও বিস্তৃত করেছে। একটি প্যান্ডেল কখনও হয়ে উঠছে কোনও গ্রামের প্রতিরূপ, কখনও কোনও হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্যের স্মৃতি, কখনও বা শিল্পীর কল্পনার সম্পূর্ণ নতুন জগৎ।
এই কারণেই পুজো দেখতে বেরোনো আসলে এক ধরনের চলমান শিল্প-ভ্রমণ।
বনেদি বাড়ির পুজো: ইতিহাসের উঠোনে
বাংলার পুরনো বনেদি বাড়ির পুজোও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। বহু পরিবারে পুজোর ইতিহাস কয়েকশো বছরের। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সামাজিক পরিবর্তন, জমিদারি সংস্কৃতি, পরিবারগুলির উত্থান-পতন এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা।
ঠাকুরদালানে দাঁড়ালে শুধু প্রতিমা দেখা হয় না—দেখা যায় একটি পরিবারের অতীত। পুরনো বাড়ির দেওয়াল, খিলান, উঠোন, পুজোর বাসন, পুরনো রীতি—সবকিছু মিলে যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর।
কাশফুল থেকে পাহাড়
দুর্গাপুজোর ভ্রমণ মানেই শুধু পুজোমণ্ডপ দেখা নয়। শরৎকাল নিজেই এক অসাধারণ ভ্রমণঋতু।
সমতলের বাংলায় তখন কাশফুলের সাদা ঢেউ। মাঠের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় শরতের নীল আকাশ। আবার উত্তরের পাহাড়ে পরিষ্কার আকাশে দূর থেকে দেখা যায় তুষারশুভ্র পর্বতশ্রেণি।
পুজোর কয়েক দিনের ছুটি তাই হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
উৎসব, খাবার ও মানুষের কাছে যাওয়া
দুর্গাপুজোর ভ্রমণ আর খাবার—এই দুইকে আলাদা করা কঠিন। কলকাতার পুজোর রাতে ফুচকা, কচুরি, রোল, বিরিয়ানি থেকে পুরনো মিষ্টির দোকানের সন্দেশ—সবই ভ্রমণের অভিজ্ঞতার অংশ। আবার গ্রামের পুজোয় মিলতে পারে বাড়ির রান্না, ভোগের খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস কিংবা স্থানীয় কোনও বিশেষ পদ।
একটি অঞ্চলের খাবার আসলে সেই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাসও বহন করে।
আর তাই এবারের পুজোয় শুধু বড় প্যান্ডেলের ছবি তুলে ফিরে আসবেন না। সম্ভব হলে কোনও পুরনো পুজোর গল্প শুনুন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। মণ্ডপের শিল্পীদের দেখুন। গ্রামের রাস্তা ধরে একটু হাঁটুন। কোনও অচেনা নদীর ধারে বসে সন্ধ্যার আলো দেখুন।
তবেই হয়তো বুঝবেন—
এই সংখ্যায়
শারদ সম্ভার | সেপ্টেম্বর ২০২৬
০১ | প্রধান সম্পাদকের কথা — “শারদ সঞ্জীবনী”
শরৎ, দুর্গাপুজো ও ভ্রমণের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে সম্পাদকীয় ভাবনা।
১০ | কলকাতার থিমপুজো ২০২৬
প্যান্ডেল গাঁথা চালচিত্রে চিরন্তন আবাহন
— হীরক নদী
১৭ | কলকাতার বনেদি পুজো
কলকাতার দুটি বনেদি বাড়ির পুজো
— শুভজিৎ দে
৩০ | গ্রামবাংলার দুর্গা
দূর গ্রামের দুর্গা
— তৌফিক বসু
৩৬ | পূর্ব মেদিনীপুরের ঐতিহ্য
পূর্ব মেদিনীপুরের চারটি প্রাচীন দুর্গাপুজো
— শীর্ষেন্দু গায়েন
৩৮ | হুগলি জেলার পুজো
হুগলি জেলার চারটি হরগৌরী পুজো
— অর্ণব পাই
৪০ | কোননগরের ঐতিহ্য
কোননগরের পাঁচটি পারিবারিক দুর্গাপুজো
— কিজল বসু
৪২ | গ্রামবাংলার পারিবারিক পুজো
গ্রামবাংলার কয়েকটি অন্যরকম পারিবারিক দুর্গাপুজো
— শুভদীপ শাস্ত্রী
৪৪ | গ্রামের নাম কাশ্যপ
গ্রামের নাম কাশ্যপ
— সন্দীপন মজুমদার
৪৬ | বাংলার বাইরে
ছত্তিসগড়ের বাস্তারে অন্য দেশের দর্শনে
— সুব্রত চট্টোপাধ্যায়
৫০ | অন্যরকম দুর্গার সন্ধানে
সুজাগ্রামের ঘোষবাড়িতে একই মূর্তিতে দেবী কালী ও দুর্গা
— দেবযানী বসু
৫৪ | উৎসব ও প্রকৃতি
সাসাই উৎসব দেখে সাসাই হরিণের খোঁজে
— শান্তনু মাহাতি
৬২ | তীর্থের পথে
বার বার বারাণসী
— পৃথ্বীরাজ ট্যাং
৬৬ | দুর্গাপুজোর ভ্রমণ
দুর্গাপুজোয় হরিদ্বার ও ঋষিকেশ
— উর্মি নাথ
এই সংখ্যার বিশেষ আকর্ষণ
🌾 পুজো ও গ্রামবাংলা — শহরের ঝলমল আলো পেরিয়ে পুরনো পুজোর বাড়ি, গ্রামের উঠোন এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের সন্ধান।
🏛️ ঐতিহ্যের দুর্গা — বনেদি বাড়ি ও প্রাচীন পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয়।
🎨 শিল্পের পুজো — কলকাতার থিমপুজোর প্যান্ডেল, প্রতিমা এবং শিল্পীদের সৃষ্টিশীলতার গল্প।
🏔️ পুজোর ছুটিতে ভ্রমণ — পাহাড়, নদী, তীর্থ ও প্রকৃতির পথে ছোট-বড় ভ্রমণের পরিকল্পনা।
📷 ছবিতে দুর্গোৎসব — বাংলার নানা প্রান্তের দুর্গাপুজোর বৈচিত্র্যময় আলোকচিত্র।
আজকের পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। উৎসবের আয়োজন বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, ভ্রমণের ধরন বদলাচ্ছে। কিন্তু মানুষের আনন্দের প্রয়োজন বদলায়নি। মানুষ এখনও বাড়ি থেকে বেরোয় অচেনাকে চেনার জন্য। এখনও কোনও নতুন জায়গায় পৌঁছে বিস্ময়ে চারপাশটা দেখে। এখনও একটি উৎসব অপরিচিত মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে।
‘ভ্রমণ’-এর এই দুর্গাপুজো বিশেষ সংখ্যা সেই কাছে আসারই একটি ছোট্ট প্রচেষ্টা।
এবারের পুজোয় তাই একটু ধীরে চলুন। পথের দিকে তাকান। মানুষের দিকে তাকান। প্রকৃতির দিকে তাকান। ইতিহাসের দিকে তাকান।
শরতের কাশফুল পথ দেখাক। ঢাকের বাদ্যি ডাক দিক দূরের কোনও অচেনা গন্তব্যে।
শুভ শারদীয়া।
শুভ ভ্রমণ।
— প্রধান সম্পাদক




